বাগদাদের রাস্তায় হাঁটছে শবনম। খুলাফা মসজিদ ছাড়িয়ে, জুমুরিয়া স্ট্রিট ধরে বাজারের দিকে। পথেই আল-কিন্দি হাঁসপাতাল, ধর্মগুরু আব্দুল কাদেরের সমাধি। প্যালেস্টাইন হোটেল থেকে দূরত্ব বড়জোর মাইল খানেক, পথচারীরাই বাজারের রাস্তা চিনিয়ে দিয়েছে। ওখানেই ওষুধের দোকান, তেজোর হাতে লেখা চিরকুট সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছে, বড়িগুলো খেয়ে নিলেই দিদির জ্বর নেমে যাবে।
দুবাইর কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল প্যালেস্টাইন হোটেল। লিফট থেকে নামতেই ঝাড়লন্ঠনের ঝলক। পায়ের তলায় ঠাণ্ডা মার্বেলের ফরাস, নাকে গোলাপের সেন্ট। কালো কোট পরা ছেলেগুলো ট্রে হাতে দৌড়চ্ছে, অতিথিদের হাতে হাতে পানীয়র গেলাস ধরিয়ে দিচ্ছে। কালো সিল্কের বোরখায় ঢাকা আরব মহিলাদের পিছু পিছু ঘুরছে বাচ্চা কোলে ফিলিপিনো দাই। নজর করে ওকে দেখছে না কেউ, থামের আড়ালে ডেকে ফিসফিস করে ঘরে নিয়ে যাবার প্রস্তাব দিচ্ছে না, বা মুঠো করে দিনার। কাঁচের আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখেছে শবনম, মামুলি কামিজ পরা চেহারাটা চিনতেই পারেনি।
যুদ্ধের বাজারে ডাক্তারের খোঁজ পাওয়া যায়নি, অসুখবিসুখে নিজের চিকিৎসা নিজেই করে নিচ্ছে এখানকার লোক। একদফা জলপট্টি দিয়ে বেরিয়েছে শবনম, ফিরে এসে ওর দিদিকে কলঘরে নিয়ে চান করিয়ে দেবে।
মাঝরাস্তায় শুয়ে পড়ে গাড়ি আটকে দিচ্ছে একদল ভিখিরি, পয়সা না দিলে ছাড়ছে না, হর্নের আওয়াজে কান ঝালাপালা হবার যোগাড়। প্রিয়জন মারা গেছে তাই বুক চাপড়ে সুফি দরগায় চাদর চড়াতে চলেছে জনা দশেক সদস্যের এক পরিবার। আল-রশিদ স্ট্রিটে বাসনের ঝনঝনানি ছাপিয়ে আজানের ডাক শুনতে পাচ্ছে শবনম। ডান দিক মুড়লেই টাইগ্রিস নদীর ব্রিজ। ওপারে চিড়িয়াখানা। যুদ্ধ লাগলে চার-চারটে সিংহ ওখান থেকেই পালিয়েছিল, বোমাবাজি থামলেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। আজকাল নাকি মরুভূমিতে সিংহের ডাক শোনা যায় - গুজব রটানোর লোকের অভাব নেই বাগদাদে।
সোরজা বাজারের দোরগোড়ায় পৌঁছেও ওষুধের দোকান খুঁজে পাওয়া যায়নি। হালাল পশুর ধড়, টাইগ্রিসের মাছ, চাল-গম, আরেবিয়ার মিঠাই। কাঁচা শাকসবজির গলি পেরলেই মেয়েদের পোশাক পরানো সারবধ্য কাঠের পুতুল। আবায়া, কাফতান, হিজাবের পেছনে লুকনো অন্তর্বাস। দোকানিদের ডাকাডাকিতে কান না দিয়ে ভিড় কাটিয়ে এগিয়ে চলে শবনম। কিছুক্ষণ থেকেই কে যেন ওর পিছু নিয়েছে। আড়চোখে খেয়াল রাখে লোকটাকে। কে ও? দালাল নাকি? ওকে চিনতে পেরেছে? শেখ আব্বাসের গুষ্টির কেউ হবে, নয়তো পুরনো কোনও মালিকের সাগরেদ। আরও কয়েক জোড়া চোখ ওকে নজরে নজরে রেখেছে, গলিতে পা ফেলতেই মুখে মুখে কথা চালাচালি হয়ে যাচ্ছে। গোটা বাজারটাই ওকে শ্যেনদৃষ্টিতে বেঁধে ফেলেছে। ওই যে, সাদ্দামের ক্ষতবিক্ষত ছবিটার সামনে বসে যে লোকটা ওকে চোখের ইশারায় ডাকছে, সেই কি ওদের পাণ্ডা? এবার ওকে দলবেঁধে আটক করবে, গাধায় টানা গাড়ির পেছনে মুখ বেঁধে নিয়ে যাবে নিজেদের ডেরায়। বস্তায় পুরে চালান দেবে মানুষ বিক্রির বাজারে।
Write a comment ...