পুরনো স্কুল বাসের পঁয়ত্রিশটা সিটই ভর্তি। খালেদের অনুরোধে দুই বাচ্চাকে কোলে তুলে নেয় বাপমা, ফাঁকা সিটে বসে পড়ে তেজো আর শবনম। কালো আবায়ায় সর্বাঙ্গ ঢাকা, তাই ওদের বিদেশি বলে চিনতে পারেনি কেউই। শবনমের সাথে আরবিতে দু’এক কথায় সহজ হয়ে যায় সদ্য সন্তানের জন্ম দেওয়া ইয়াজিদি মহিলা। ওরা বহু দূর থেকে আসছে, ঐতিহাসিক নিনেভ জেলার সিঞ্জর শহরে ওদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে জঙ্গিরা, নিজের আর দুই মেয়ের প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছে বছর তিরিশেকের গুল আর ওর স্বামী তইমুর। ওরা দু’জনেই উচ্চশিক্ষিত। সুফিদের সঙ্গে হাবভাবে মিল বলেই ইয়াজিদিদের ওপর জঙ্গিদের আক্রোশ, পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ ছেলেদের মেরে ফেলা হচ্ছে আর মেয়েদের ধর্ষণ। যদিও মুসলিম, ক্রিশ্চান, ইহুদি আর পার্সিদের ধর্ম মিলেজুলেই ওদের ধর্ম, যার প্রধান আরাধ্য ময়ূর সদৃশ স্বর্গের ফেরেশতা।
“দুবাইয়ে এদের দেখেছি, কাজ করত আমাদেরই মতো,” তেজোকে বলে শবনম। “ভাল নাচতে পারত না বলে মার খেত খুব।”
গুলই ওদের খালেদকে চিনিয়ে দেয়। ড্রাইভারের পাশে বসে বাসের ঝাঁকুনিতে চোখ বন্ধ করে ঢুলছিল লোকটা। একমুখ খোঁচা দাড়ি, সার্টের বোতাম ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা নেয়াপাতি ভুঁড়ি, চোখের তলায় কালি। মাঝে মাঝে এক চোখ খুলে ড্রাইভারের সঙ্গে হাল্কা রসিকতার ফাঁকে চারদিকের হালচাল বুঝে নিচ্ছিল। আর পেল্লাই হাই।
“খালেদ না থাকলে বাঁচতাম কি না সন্দেহ। বাসের অর্ধেক এতক্ষণে কবরে ঢুকে যেত ঠিকই!” কোলের মেয়েকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতেই বলছিল গুল। “মানুষের ওপর রাগ হলে ঘুমিয়ে পড়েন ঈশ্বর, তখন ওঁর কাজটা করে দেন মেলেক, মানে ময়ূর। ইয়াজিদি, শিয়া, সুন্নি, কুর্দ - সবার কাছে খালেদ সেই ময়ূর।”
“মানে বিপদে পড়লে ওর বাসে চড়া ছাড়া উপায় নেই!”
“ঠিক!” তেজোর রসিকতায় হেসে ওঠে গুল। “কোন শহরে আমেরিকান বোমার ধাক্কায় বাড়ির নীচে লোকজন চাপা পড়েছে, কোথায় মুক্তিপণ না দিলে গলা কাটবে বলে হুমকি দিচ্ছে জঙ্গিরা, মহামারি লেগেছে যে গ্রামে - খবর পেলেই দুর্গতদের কী করে বাঁচানো যায় সেই নিয়ে ফন্দি আঁটে খালেদ। তলে তলে যোগাযোগ খাটিয়ে উদ্ধার করাই ওর কাজ।”
Write a comment ...