মরুভূমির ঝড়ে আটকে পড়েছে তেজো। কুয়েট ছেড়ে ইরাকের বর্ডার পার করার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই। এ অঞ্চলে এই ঝড়ের নাম হাবুব। গাড়িতে উঠেই গুইগাই করছিল মাসুদ, ওর ড্রাইভার। ঝড় ওঠবার খবর আগেভাগে জেনে গিয়েছিল বলেই, তেজোকে যাত্রার দিন পিছিয়ে দেওয়ার জন্য সাধাসাধি করছিল। দিন দুয়েক বাদে মরুভূমি বেড়াতে গেলে কেমন হয়? এর মধ্যে প্লেনে চড়ে দুবাই ঘুরে এলে মন্দ কী? কুয়েটের চেয়েও ঢের ভাল শপিং ওখানে, খাওয়াদাওয়াও।
হাবুব যে সে ব্যাপার নয়। আরেবিয়ায় এই রকম ঘূর্ণিঝড় বছর দুয়েক অন্তর মরুভূমির ভেতর থেকে হুঙ্কার দিয়ে ধেয়ে আসে। কয়েক লক্ষ টনের বালির পাহাড় কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘিরে ফেলে শহরগুলোকে। মনে হয় একটা কমলা রঙের সমুদ্র ডুবিয়ে মারবে সব্বাইকে - প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকেই একে নরকের জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডর সঙ্গেও তুলনা করেছে, যেমন করেছিলেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক হেরোডোটাস। একটা গোটা সৈন্যবাহিনীকে একগ্রাসে গিলে ফেলার মতো ঝড়, শহরকে শহর আণবিক বোমায় উড়িয়ে দেওয়ার মতোই বিধ্বংসী।
ঝুঁকি না নিয়ে একটা স্কুলের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিল ওরা। প্রয়োজন হলে এখানেই রাত কাটাতে হবে, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে স্কুলের টিফিন খেয়ে নেবে। স্যাটেলাইট ফোনটা চালু রাখা সবচেয়ে আগে দরকার, আর পর্যাপ্ত জলের সাপ্লাই। শেষমেশ কমের ওপর দিয়েই বয়ে যায় হাবুব। হাল্কা ঠাণ্ডা হাওয়া চালু হতেই অদ্ভুত গোলাপি আলোয় ভেসে যায় চারিদিক।
ঘণ্টা চারেকের রাস্তা তিন ঘণ্টায় পার করার মতো স্পিডে দৌড়চ্ছিল মাসুদ, জোরে আরবি গান চালিয়ে। এটা খাঁটি মনস্তত্ত্বের ব্যাপার - “ওয়ার সাইকোলজি” নিয়ে একাধিক ব্রিফিং ওর মনে পড়ে যায়। অত্যাধিক গতি, হইহুল্লোড়, ডিপ্রেশান, হটাৎ চুপ মেরে যাওয়া - সবই আক্রান্ত মানুষের বহিঃপ্রকাশ। ভীত নয় এমন কেউ আছে নাকি ইরাকে?
কুয়েটের সুক থেকে কেনা বোরখাটা সিটের তলায় লুকিয়ে রাস্তার ওপর কড়া নজর রেখেছিল তেজো। চেকপোস্টে মেরিন গার্ড থাকলে অসুবিধে নেই, নইলে চট করে ওটা পরে নিতে হবে। আমেরিকানদের ভালবাসুক ছাই না বাসুক, মাথা না ঢেকে বন্ধু ইরাকি সেনারও মুখোমুখি হওয়া সমীচীন হবে না। তাতে গাড়ি আটকে জিজ্ঞাসাবাদের সম্ভাবনা বাড়বেই, হেনস্থা হতে পারে ওদের দু’জনেরই। এই অঞ্চলে এখনও ইসলামিক জঙ্গিরা এসে পৌঁছয়নি, নইলে একা মেয়ের রাস্তায় বেরনো আত্মহত্যারই সামিল।
কালো অ্যাসফল্টের রাস্তার ডাইনে-বাঁয়ে আগুনে পুড়ে ছাই সাঁজোয়া গাড়ি আর ট্যাঙ্কের কবরস্থান। যুদ্ধের সাক্ষী পরিত্যক্ত কামান, মেশিন গান, বালির বস্তায় ঢাকা ট্রেঞ্চ। মাত্র কিছুদিন আগেই এখানে রাষ্ট্রসংঘের নিষেধাজ্ঞা স্বত্বেও কুর্দি সেনাবাহিনীর ওপর বোমাবর্ষণ করে গেছে তুর্কি এয়ারফোর্স। সামান্য কয়েকশো মাইল উত্তরে, তেলের খনির দখল নিতে শিয়া মাহাদি যোদ্ধাদের সঙ্গে সুন্নি ইরাকি আর্মির সংঘাতে মারা গেছে দু’পক্ষেরই অগুনতি সোলজার। মাইকেল রুবিনের ভবিষৎবাণী ফলে গেছে অক্ষরে অক্ষরে, সাদ্দামের পর গোটা দেশটাকে হস্তগত করতে পারেনি কেউই। ফলে মরছে ইরাকিরা, পুড়ছে গ্রাম, বন্দরে বন্দরে জমা হচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকা থেকে আমদানি করা অস্ত্র, আহতদের ওপর সজ্ঞানেই অস্ত্রপচার চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন ডাক্তাররা।
Write a comment ...